Legend Foundation BD

← Blog
Blog

আজও কান পাতি গেটে, এই বুঝি পেপার মামা এল

আজও কান পাতি গেটে, এই বুঝি পেপার মামা এল

তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে খুব অসুস্থ হয়ে যাই। বিলিরুবিনের মাত্রা বাড়তে থাকে। রোগটি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় পুরোপুরি বেড রেস্টের পাশাপাশি আমার কাছে তখন অন্যদের আনাগোনাও কমে যায়। তার ওপর পাড়ার এক পাগলাটে ডাক্তার পরামর্শ দিয়ে যান, আমাকে যেন সব মানুষের কাছ থেকে দূরে রাখা হয়। ফলে বন্ধুদের সঙ্গে আমার আর দেখা হতো না। যেহেতু স্কুলে যেতাম না, আম্মু আমার একমাত্র ছোটবোনটিকেও কাছে আসতে দিত না। রোগটি ছোঁয়াচে কি না, পাছে সেও আক্রান্ত হয় কি না এই ভয়ে। ভয়ংকর একাকিত্ব আর স্বজনদের ভয়ার্ত দৃষ্টি দেখতে দেখতে কাটত একেকটি দিন।

একদিন আম্মু বললেন, ‘তোমার একাকিত্ব নিরসনে কিছু ব্যবস্থা করব।’ আমাদের টেলিভিশন ঠিক করা হলো। বিশ্বকাপ ফুটবল চলছিল তখন। আর্জেন্টিনা প্রথম রাউন্ডেই বাদ হয়ে যাওয়ায় খেলার প্রতি মোহও কমে গেল। অঙ্ক বই নিয়ে সমানুপাতের কিছু অঙ্ক করি, আর সম্পাদ্য। অন্য বইগুলো পড়তেও ইচ্ছা করে না, বিছানাবন্দী জীবন অসহ্য লাগে।

সেকালে, প্রায় বিশ বছর আগে খুব সচেতন লোক ছাড়া বাসাবাড়িতে তেমন কেউ পত্রিকা রাখতেন না। অবস্থা বিবেচনায় আম্মু পত্রিকা রাখতে একজন হকার ঠিক করলেন, যিনি পেপার দিতেন বেলা প্রায় ১১.৩০টা বা দুপুর ১২টার দিকে! এ ছিল আরেক মহাবিরক্তি! পেপারের অপেক্ষায় থেকে আগ্রহটাই মরে যেত। অনেকটা, বেটার লেইট দ্যান নেভার টাইপ।

কয়েক দিন পর আম্মু খুঁজে আরেকজন লোক নিয়ে এলেন, যিনি সকালে পেপার দিতে পারবেন। আম্মু বললেন, লোকটি হকার নয়, তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনে কাজ করেন এবং তাঁর লাইব্রেরি আছে। তিনি তাঁর নিজের জন্য যেসব পেপার নেবেন, অতিরিক্ত হিসেবে আমাদেরও সাপ্লাই দেবেন এমন।

লোকটির নাম আসাদউল্লাহ, হুজুর ধরনের, মধ্যবয়সী। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরেন, সাদা পাগড়ি মাথায়, কালো রংয়ের সাইকেলে চলতেন। ঠিক সকাল ৮.২০ থেকে ৮.৩০–এর মধ্যে তিনি পেপার দিতেন। গেট খুললে প্রথমে শুদ্ধ উচ্চারণে সালাম দিতেন। লোকটির আগে আমরা তাঁকে সালাম দিতে পারতাম না বা পারিনি কখনো! লোকটির শুদ্ধ উচ্চারণের সালাম শুনে আম্মু আমাকে বকতেন। বলতেন, ‘কখনো কাউকে আগে সালাম দিতে পারো না!’

প্রথমে আমরা রাখতাম যুগান্তর পত্রিকা। বছর ঘুরলে প্রথম আলো রাখতে ধরি। তখন প্রথম আলোর ছুটির দিনেতে ঘরমন জানলা দিত, থাকত কাওসার আহমদ চৌধুরীর রাশিফল। এই লোকটি রেগুলার পেপার দিতেন, প্রায় একই সময়ে। আমরাও ঠিক এই সময়েই পেপার নিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠি। পেপারের সাপ্তাহিক বিভিন্ন ফিচারের সঙ্গে মিশে যায় আমাদের জীবনাচার।

এরই মধ্যে আমার শরীর সেরে ওঠে। অসুস্থতা আমাকে একজন নিয়মিত খবরের কাগজ পাঠকে পরিণত করে। অবশ্য এর পেছনে আসাদুল্লাহর সময়ানুবর্তিতার অবদানও অনেক।
ভদ্র আচরণের দরুন আমাদের পরিবারের লোকেরাও আসাদুল্লাহকে পছন্দ করতেন। আমার খালা-মামাদের বিয়েতে অতিথি হিসেবেও তিনি উপস্থিত হয়েছেন। অনেকে ভাবতেন, তিনি আমাদের আত্মীয়। ঈদের সময় আসাদুল্লাহ তাঁর বাড়ির ঠিকানা বিস্তারিত জানিয়ে আমাদের সবাইকে যাওয়ার অনুরোধ করতেন, যদিও কখনোই যাওয়া হয়নি।

পেপার পড়া নিয়ে আমাদের মনোমালিন্যও হতো। আম্মু বলতেন, তিনি গরম পেপার ছাড়া পড়তে পারেন না। আমি আর ছোটবোন ন্যান্সি কার্টুন পড়তাম। আরেকটা কার্টুন দিত, নাম ভুলে গিয়েছি; আমার বোন নাম দিয়েছিল পিকু। এ ছাড়া অন্য আলো, বা খেলার পাতা সবই পড়তাম।

আসাদুল্লাহকে আমরা ডাকতাম মামা। আমার ছোটবোন, ইকরাও ডাকত পেপার মামা। পেপার নেওয়ার সময় অল্প সময়ে সে পেপার মামার সঙ্গে টুকটাক গল্প করত। ও তখন অনেক ছোট, মাঝেমধ্যে বাঁ হাতে পেপার নিত। ডান হাতে কিছু নেওয়ার অভ্যাসটা পেপার মামাই শিখিয়েছিলেন তাকে। ও যখন এসএসসি দেয়, পেপার মামা তাকে ২০০ টাকা দিয়েছিলেন কলম কিনতে। লোকটি আমাদের সব সময় আপনি করে বলতেন। নিরবচ্ছিন্ন সার্ভিস পাওয়ায় পেপার মাঝেসাঝে না এলে কেমন লাগে, সেটা আমরা টেরই পেতাম না। তবে লোকটি মাঝেমধ্যে অসুস্থ হতেন এবং কয়েক দিন পেপার মিস যেত। আমরা পেপার মিস যাওয়ার বিরক্তি নিয়ে বিকল্প খুঁজতাম; কখনো সব সময় সার্ভিস দেওয়া লোকটি কি রোগে আক্রান্ত হন, জানতে চাইনি সে রকমভাবে!

লোকটি তাঁর বিয়ের দাওয়াত আমাদের দিয়েছিলেন, তাঁর ছেলে হওয়ার খবর জানিয়েছিলেন; তবে সবচেয়ে মুগ্ধ করেছিল সব সময় সবার আগে সালাম জানিয়ে। এত সালাম তিনি দিয়েছেন আমাদের এবং অন্য মানুষদের!

২০২০–এর শেষ দিকে, কয়দিন পেপার আসে না। আম্মু ভেবেছেন যথারীতি, আসাদুল্লাহ হয়তো অসুস্থ। খোঁজ নিয়ে জানা গেল লোকটি বিগত সপ্তাহে মারা গেছেন।

আসাদুল্লাহ প্রায় ১৭ বছর টানা আমাদের বাসায় পত্রিকা দিয়েছেন। এখনো ঠিক সেই সময়টাতে বাসার গেটে তাঁর কড়া নাড়ার শব্দগুলো অবচেতন মনে আমাদের প্রায় সবারই মনে পড়ে। পরম করুণাময় তাঁকে ভালো রাখুক।

এই হলো আসাদুল্লাহর সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া কিংবা আমাদের পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া একজন মানুষের জীবনের বিচিত্র গল্প। প্রতিটি মানুষের জীবনের গল্প আলাদা ও বৈচিত্র্যময়। এমন বৈচিত্র্যের স্রষ্টা যিনি অন্তর্যামী, তাঁর বৈচিত্র্য বোঝা বড় দায়।

Scroll to Top